ধর্ষণের শিকার ভুক্তভোগীর পরিচয় প্রকাশ কি বেআইনি?

ধর্ষণের শিকার ভুক্তভোগীর পরিচয় প্রকাশ কি বেআইনি?

ধর্ষণের শিকার ভুক্তভোগীর নাম, ছবি ও পরিচয় প্রকাশ করা শুধু আইনগতভাবে অপরাধ নয়, বরং এটি একটি গুরুতর নৈতিক লঙ্ঘন। এটি তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, মানসিক সুস্থতা ও সামাজিক মর্যাদার ওপর দীর্ঘস্থায়ী নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বাংলাদেশসহ অনেক দেশের আইন অনুসারে ধর্ষণ বা যৌন সহিংসতার শিকার ভুক্তভোগীর নাম ও পরিচয় প্রকাশ করা দণ্ডনীয় অপরাধ। বাংলাদেশ দণ্ডবিধি, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ (সংশোধিত ২০০৩) এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮-তে ভুক্তভোগীর গোপনীয়তা রক্ষার বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা হয়েছে।

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ১৪ ধারা অনুযায়ী, ধর্ষণের মামলার তদন্ত বা বিচার চলাকালীন ভুক্তভোগীর নাম বা পরিচয় প্রকাশ করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮ অনুযায়ী, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ভুক্তভোগীর ছবি, নাম বা অন্যান্য তথ্য প্রকাশ করা হলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়।

আন্তর্জাতিকভাবে, জাতিসংঘের মানবাধিকার সংক্রান্ত নীতিমালায় (বিশেষত CEDAW - Convention on the Elimination of All Forms of Discrimination Against Women) ধর্ষণ বা যৌন সহিংসতার শিকার ব্যক্তির গোপনীয়তা নিশ্চিত করার সুস্পষ্ট সুপারিশ রয়েছে।

আইনগত দিক ছাড়াও, নৈতিকতা ও সামাজিক বাস্তবতার কারণে ধর্ষণের শিকার নারীর নাম প্রকাশ করা অত্যন্ত অনৈতিক বলে বিবেচিত হয়। মানসিক ও সামাজিক চাপ: ধর্ষণের শিকার অনেক ভুক্তভোগী সামাজিক অবস্থান, পরিবার বা সমাজের চাপের কারণে অভিযোগ করতেই ভয় পান। যদি পরিচয় প্রকাশ হয়ে যায়, তবে তিনি আরও বেশি অপমান ও প্রতিকূলতার সম্মুখীন হতে পারেন।

প্রতিশোধমূলক হামলার শঙ্কা: অপরাধীরা অনেক সময় ভুক্তভোগী বা তার পরিবারের ওপর প্রতিশোধ নিতে পারে, যা তার জীবনের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।

দ্বিতীয়বার ভুক্তভোগী হওয়ার আশঙ্কা: সমাজে ধর্ষণের শিকার নারীকে অনেক সময় সন্দেহের চোখে দেখা হয় বা তাকে ‘দোষী’ প্রমাণের চেষ্টা করা হয়। এটি তার জন্য এক ধরনের দ্বিতীয়বার ভুক্তভোগী হওয়ার (re-victimization) শামিল।

বিচার প্রক্রিয়ায় নেতিবাচক প্রভাব: অনেক ক্ষেত্রে, পরিচয় প্রকাশ হয়ে গেলে ভুক্তভোগী ও তার পরিবার মামলাটি চালিয়ে যেতে অনিচ্ছুক হয়ে পড়তে পারে, ফলে অপরাধীরা শাস্তি এড়ানোর সুযোগ পায়।

গণমাধ্যমের জন্য ধর্ষণের ঘটনার সংবাদ প্রকাশের সময় বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সাংবাদিকতার নীতিমালা অনুযায়ী, ধর্ষণের শিকার ভুক্তভোগীর নাম, ছবি বা এমন কোনো তথ্য প্রকাশ করা উচিত নয়, যা থেকে তাকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়। বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল আইন, ১৯৭৪ এবং জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালা ২০১৪-তে এ ধরনের সতর্কতা তুলে ধরা হয়েছে।

ধর্ষণের ক্ষেত্রে আইন, সমাজ ও গণমাধ্যমকে একত্রে কাজ করে ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে ভুক্তভোগীরা বিচার পাওয়ার পথে বাধার মুখে না পড়েন এবং নির্ভয়ে অপরাধীদের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারেন।

লেখক: অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট

Countdown Timer
00:01

Comments

Popular posts from this blog

চুরির অপবাদে যুবককে গাছে বেঁধে নির্যাতনের পর আগুন